মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :

কাপ্তাই বাঁধে মধ্যরাতে খুলে দেওয়া হয়েছে ১৬ জলকপাট

মাতৃভূমি সংবাদ 

জেলা প্রতিনিধী

রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে পানির চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বাঁধের ১৬ জলকপাট খুলে প্রতি সেকেন্ডে নয় হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হচ্ছে। সোমবার (৪ আগস্ট) দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিট হতে পানি ছাড়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান। প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, বর্তমানে হ্রদে পানি আছে ১০৮ দশমিক ৫ ফুট মিনস সি লেভেল। রাতের মধ্যেই কাপ্তাই হ্রদে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ছাড়া হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদের পানি। তবে ভাটি অঞ্চলের মানুষকে আতঙ্কিত না হবার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) সকাল ৯ টায় ১৬ জলকপাট ছয় ইঞ্চি করে খুলে দিয়ে সেকেন্ডে ৯ হাজার কিউসেক পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো। এর আগে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি বিপদ সীমার কাছাকাছি হওয়ায় উজান এবং ভাটি এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সোমবার (৪ আগস্ট) বিকেল ৩টা কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৬টি জলকপাট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দিয়ে ৯ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো। তবে সেই সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলেন, হ্রদে পানি বাড়ায় কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ২১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটই সচল রয়েছে। তার মধ্যে এক ও দুই নম্বর ইউনিটে প্রতিটিতে ৪৬ মেগাওয়াট করে মোট ৯২ মেগাওয়াট, তিন নম্বর ইউনিটে ৪৭ মেগাওয়াট, চার ও পাঁচ নম্বর ইউনিটে প্রতিটিতে ৪০ মেগাওয়াট করে মোট ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। পাঁচটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে প্রতিদিন ৩২ হাজার কিউসেক পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে। পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে ২৩০ থেকে ২৪৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সক্ষমতা রয়েছে। কাপ্তাই বাঁধ বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত। উজানে কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত একটি বাঁধ। কাপ্তাই হ্রদ নামে পরিচিত এটির একটি কৃত্রিম জলাধার রয়েছে যার পানি ধারণ ক্ষমতা ৫২ লাখ ৫১ হাজার একর। বাঁধ ও হ্রদটি নির্মাণের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা। ১৯৬২ সালে এটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। বাঁধের সঞ্চিত পানি ব্যবহার করে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ১৯৬২ ও ১৯৮৮ সালের মধ্যে এখানে সর্বমোট ২৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের তিন লাখ ১০ হাজার অশ্ব শক্তি জেনারেটর বসানো হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তর বাঁধ ও একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এছাড়াও এখানে কাপ্তাই ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট সোলার পিডি গ্রিড ‘কানেকটেড বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ নামে দেশের প্রথম সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত করা হয়। পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভেতরে বাঁধের পাশে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এই সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থান। জানা গেছে, ১৯০৬ সালে কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কে প্রথম চিন্তা ভাবনা করা হয় এবং সে সময়ে এ লক্ষ্যে একটি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক সমীক্ষা চালানো হয়। ১৯২৩ সালে এ ধরনের আরেকটি সমীক্ষা চালানো হয়। ১৯৪৬ সালে ই.এ. মুর কর্তৃক পেশকৃত প্রতিবেদনে বর্তমান বাঁধের অবস্থান থেকে ৬৫ কি.মি উজানে বরকলে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। ১৯৫০ সালে প্রকৌশল পরামর্শক সংস্থা মার্জ রেনডাল ভ্যাটেন কাপ্তাই থেকে ৪৮ কিলোমিটার উজানে শিলারডাকে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করে। ১৯৫১ সালে, সরকারি প্রকৌশলীগণ কাপ্তাই থেকে ১১ কিলোমিটার ভাটিতে চিতমোরামে বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবে করে। ১৯৫১ সালে, সেচ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী খাজা আজিমুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে বাঁধ নির্মাণের স্থান হিসেবে কাপ্তাইকে নির্বাচিত করা হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের আমলে ১৯৫৭ সালে কাপ্তাই বাঁধের নির্মাণ কার্য শুরু হয় ও ১৯৬২ সালে এর নির্মাণ সমাপ্ত হয়। ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট এ বাঁধটি নির্মাণ করে। সে সময় বাঁধে পানি নির্গমন পথ, জলকপাট এবং দুটি ৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কাপলান টারবাইন জেনারেটর নির্মিত হয়। প্রকল্পের জন্য তখন প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হলেও পরে তা ৪৮ কোটি ছাড়িয়ে যায়। এই প্রকল্পটির অর্থায়ন করে পূর্ব পাকিস্তান সরকার,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিদেশী অর্থনৈতিক সহযোগিতা তহবিল।১৯৮২ সালের আগস্টে এখানে একটি ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর স্থাপন করা হয়। ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে চতুর্থ এবং পঞ্চম উৎপাদক ইউনিটে ৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কাপলান ধরনের টারবাইন স্থাপন করা হয়। যার ফলে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। মাটি ভরাটের মাধ্যমে এই বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। বাঁধটির দৈর্ঘ্য ৬৭০ মিটার ও প্রস্থ ৪৫ দশমিক ৭ মিটার। এর ভিত্তি স্তরের এবং উপরিতলের প্রশস্ততা যথাক্রমে ৪৫৭ মিটার এবং ৭ দশমিক ৬ মিটার।বাঁধটি সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা থেকে ৩৬ মিটার উপরে অবস্থিত। পানি নির্গমনের জন্য বাঁধের বামদিকে ২২৭ মিটার দীর্ঘ আলাদা নির্গমপথ রয়েছে, যা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ১৬ হাজার কিউসেক পানি নির্গত হতে পারে। কাপ্তাই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দারা এই বাঁধ নির্মাণের ফলে তাদের বাড়িঘর এবং চাষাবাদযোগ্য জমি হারিয়েছে। প্রায় ১৮ হাজার পরিবার এবং এক লাখ জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। ৪০ হাজারেরও অধিক মানুষ প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্থানান্তর হয়েছিল। এ বাঁধ নির্মাণের কারণে জীববৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছিল। বন্য প্রাণী এবং তাদের বসবাস উপযোগী আবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Categories

© All rights reserved © 2023 MatrivumiSongbad
Design & Developed BY N Host BD