বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন
মাতৃভূমি সংবাদ
রিপোর্টারঃ হারুন অর রশিদ
মহান আল্লাহ মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য প্রত্যেক যুগেই নবি-রসুল পাঠিয়েছেন। আর এসব নবি-রসুল যে মহান আল্লাহর তরফ থেকে পাঠানো সত্য, তার নিদর্শনস্বরূপ তাদের মাধ্যমে আল্লাহ কিছু অলৌকিক ঘটনা দেখান, যাতে করে তারা নবিদের নবুওয়াতির সত্যতার প্রমাণ জানতে ও বুঝতে পারে এবং তাদের ওপর ইমান আনার পাশাপাশি মহান রবের ওপরও ইমান আনতে পারে। পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই আল্লাহ তাআলার ‘কুন ফাইয়াকুন’ নির্দেশে হজরত মারইয়াম (আ.) গর্ভধারণ করেছিলেন। তার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন নবি ও রসুল হজরত ঈসা (আ.)। তিনিই দোলনায় থাকা অবস্থায় বড়দের মতো কথা বলতেন। বাল্যকালেই আল্লাহপাক তাকে নবুওয়াত ও কিতাব দান করেন। নবুওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব লাভের পর আল্লাহ তাআলা তাকে বেশ কিছু মুজিজা (অলৌকিক ক্ষমতা) দান করেছিলেন। যে মুজিজাগুলোর বর্ণনা উঠে এসেছে পবিত্র কুরআনে। সুরা আল ইমরানের ৪৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর বনি ইসরাইলদের জন্য রসুল হিসেবে তাকে মনোনীত করবেন। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছি। (তা হলো) আমি তোমাদের জন্য মাটির পাখির আকৃতি তৈরি করে দিই। তারপর তাতে যখন ফুঁক দিই, তখন তা আল্লাহর হুকুমে উড়ন্ত পাখিতে পরিণত হয়ে যায়। আর আমার স্পর্শে সুস্থ হয়ে ওঠে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগী। আর আমি আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করে দিই। আমি তোমাদের বলে দিই, যা তোমরা খেয়ে আসো এবং যা ঘরে রেখে আসো।’এভাবে আল্লাহ তাআলা হজরত ঈসা (আ.)কে বেশ কিছু অলৌকিক শক্তি দান করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো, কোনো জন্মান্ধ ব্যক্তির চোখে তিনি তার পবিত্র হাত স্পর্শ করলেই অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টি ফিরে আসত। আবার কুষ্ঠ রোগীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে রোগ ভালো হয়ে যেত। দীর্ঘদিনের মৃত ব্যক্তিকে নাম ধরে ‘কুম বিইজনিল্লাহ’ বললেই ঐ ব্যক্তি জীবিত হয়ে যেত। কেউ বাড়ি থেকে কী খেয়ে এসেছে এবং বাড়িতে কী রেখে এসেছে, তিনি তা-ও বলে দিতে পারতেন। হজরত ঈসা (আ.) তার অনুসারীদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতি খাবার ‘মায়েদা’ তথা বেহেশতি খাবারসমৃদ্ধ দস্তরখানার ব্যবস্থা করেছিলেন। আল কুরআনে ‘মায়েদা’ নামে বিশেষ একটি সুরাও আছে। এই মায়েদা ছিল তার নবুওয়াত ও রিসালাতের বিশেষ প্রমাণ। এ সবই ছিল নবি ঈসা (আ.)-এর বিশেষ ক্ষমতা। তিনি প্রয়োজনের আলোকে নবুওয়াত ও রিসালাতের সত্যতায় এগুলোর প্রয়োগ করতেন।হজরত ঈসা (আ.) ছিলেন বনু ইসরাইল বংশের সর্বশেষ নবি ও কিতাবধারী রসুল। তিনি ইঞ্জিল কিতাব লাভ করেছিলেন। তার পর থেকে শেষ নবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর আবির্ভাব পর্যন্ত আর কোনো নবি আসেননি। এই সময়টাকে ‘রসুল আগমনের বিরতিকাল’ বলা হয়। কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার অব্যবহিত কাল-পূর্বে হজরত ঈসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশে আবার পৃথিবীতে আসবেন এবং মুহাম্মদি শরিয়ত অনুসরণে ইমাম মাহদির নেতৃত্বে সারা পৃথিবীতে শান্তির রাজ্য কায়েম করবেন। তিনি উম্মতে মুহাম্মদির সঙ্গে সংস্কারকাজে ব্রতী হবেন। এই বার্তা আল্লাহপাক তার সর্বশেষ নবি মুহাম্মদ (স.)-এর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। হজরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মোট ১৫টি সুরায় ৯৮টি আয়াতে বলেছেন।হজরত ঈসা (আ.)-এর আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই এসে যায় তার মা ও নানির কথা। কেননা, তাদের ঘটনাবলির সঙ্গে ঈসা (আ.)-এর জীবনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। পূর্ববর্তী পয়গম্বরদের শরিয়তে প্রচলিত ইবাদত পদ্ধতির মধ্যে আল্লাহর নামে সন্তান উত্সর্গের রেওয়াজ চালু ছিল। এসব উত্সর্গিত সন্তানদের পার্থিব কোনো কাজকর্মে নিযুক্ত করা হতো না। এই পদ্ধতি অনুযায়ী হজরত ঈসা (আ.)-এর নানি, অর্থাত্ হজরত ইমরান (আ.)-এর স্ত্রী নিজের গর্ভস্থ সন্তান সম্পর্কে মানত করেন যে, এই সন্তান জন্মের পর তাকে বাইতুল মোকাদ্দাসের খেদমতের জন্য নিয়োজিত করা হবে। তিনি ভেবেছিলেন তার গর্ভের সন্তান হয়তো পুত্রসন্তান হবে। কিন্তু দেখা গেল তিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ঈসা (আ.)-এর মা হজরত মারইয়াম (আ.)-এর জন্মের ঘটনাবলি সুরা আল ইমরানের ৩৫ থেকে ৩৮ আয়াত পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। হজরত মারইয়াম (আ.) জন্মের পর একটু বড় হলেই তাকে বাইতুল মোকাদ্দাসের খেদমতকারিণী হিসেবে হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর তত্ত্বাবধানে সমর্পণ করা হয়।জাকারিয়া (আ.) বাইরে থেকে এসে মারইয়াম (আ.)-এর কক্ষে প্রবেশ করলে দেখতেন অমৌসুমি ফলে ভরপুর। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলে জবাবে বলেন, ‘এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে দেওয়া হয়।’ এভাবে মারইয়াম (আ.) কক্ষে অবস্থান করতেন আর বাইতুল মোকাদ্দাসের খেদমত করতেন। তার কক্ষের পূর্ব দিকে খেজুরের বাগান ও ঝরনাধারা ছিল, সেখানে তিনি পর্দা টানিয়ে মাঝেমধ্যে পায়চারি করতেন। তিনি একদিন সেখানে পায়চারি করছিলেন, এমন সময় হঠাত্ মানুষের বেশে সেখানে জিবরাইল (আ.) উপস্থিত হন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি ভীত হয়ে পড়েন। নিজেকে পুরোপুরি আড়াল করে নেন। জিবরাইল (আ.) বলেন, মারইয়াম! ভয় পেয়ো না, আমি তোমার রবের তরফ থেকে এসেছি এক শুভ সংবাদ দিতে। শুভ সংবাদটি হচ্ছে, তোমার পুত্রসন্তান জন্ম নেবে। মারইয়া (আ.) বললেন, এটা কীভাবে সম্ভব! আমাকে তো আজও পর্যন্ত কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি! এরপর জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে তার মধ্যে পবিত্র রুহ ফুঁকে দিলেন। হজরত মারইয়াম (আ.) গর্ভবতী হলেন, তিনি বিষণ্ন মনে দিন কাটাতে লাগলেন।আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত ঈসা (আ.) ভূমিষ্ঠ হলেন। লোকলজ্জায় তিনি লোকালয়ে আসতে কিছুটা সংকোচ বোধ করছিলেন। আল্লাহ তাকে নির্দেশ করলেন, ‘যাও, মানুষের কাছে গিয়ে আমার এই মহা কুদরত প্রকাশ করো।’ (সুরা মারইয়ামের ১৬ থেকে ২৯ আয়াত পর্যন্ত এর বিষদ বিবরণ এসেছে)। লোকেরা তাকে এই সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এর জবাব দেব না, আমার কোলের সন্তানই তোমাদের সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেবে। লোকেরা দোলনার শিশু ঈসা (আ.)কে জিজ্ঞেস করলে তিনি (কুরআনের ভাষায়) বললেন, [সুরা মারইয়ামের ৩০ ও ৩২ আয়াতের বর্ণনা] ‘আমি আল্লাহর দাস। তিনি আমাকে ইঞ্জিল কিতাব দান করেছেন এবং আমাকে নবি করে পাঠিয়েছেন। আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে কঠোর নির্দেশ করেছেন, যত দিন আমি জীবিত থাকি, তত দিন যেন সালাত ও জাকাত আদায় করি। আর আমি যেন আমার মায়ের অনুগত থাকি। আল্লাহ আমাকে হতভাগা করেননি।’হজরত ঈসা (আ.) ইহুদিদের চক্রান্তের শিকার হয়ে নির্যাতিত হয়েছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাকে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন। (যা সুরা আল ইমরানের ৫২ থেকে ৫৫ ও সুরা নিসার ১৫৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ হয়েছে।) কিয়ামতের প্রাক্কালে তিনি পৃথিবীতে এসে ইমাম মাহদি (আ.)-এর নেতৃত্বে সারা পৃথিবীতে শান্তি কায়েম করবেন।
Leave a Reply