শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন
মাতৃভূমি সংবাদ
নিজেস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন প্রায় তিনদিন পার হলেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আগুনের উৎসস্থল থেকে চারপাশের ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করছে উপজেলা প্রশাসন।
এদিকে গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান শনাক্ত করতে নমুনা সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর থেকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোটখাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণের কাজ শুরু হয়। গ্যাসের নির্গমন অব্যাহত থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, আগুনের উৎসস্থল থেকে ২০০ মিটার এলাকার মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে ছোটখাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় ভূগর্ভ থেকে তীব্র বেগে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে অবিরাম গ্যাস নির্গত হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
গ্যাসের উৎস শনাক্তে নমুনা সংগ্রহ
গ্যাসের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করতে বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নলকূপ খননের সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। ভূগর্ভের কোনো ফাটল দিয়ে সেখান থেকে গ্যাস ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে।
তিনি বলেন, পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ ছাড়া গ্যাসের প্রকৃতি, উপাদান ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর গ্যাসের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। গ্যাসের নির্গমন বা চাপ জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে বলেও সতর্ক করেন এই কর্মকর্তা।
তার ভাষ্য, এতে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আপাতত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
১৫ কিলোমিটার এলাকায় বন্ধ ছিল বিদ্যুৎ
গ্যাসের আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এতে প্রায় চার হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী কাইজার নুর জানান, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে বুধবার গভীর রাতে তা পুনরায় চালু করা হয়।
আতঙ্কের অবসানে সরকারি উদ্যোগ চান স্থানীয়রা
দীর্ঘ সময় ধরে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হওয়া এবং আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। আগুনের উৎস, গ্যাসের প্রকৃতি এবং নির্গমন বন্ধ হওয়ার সময় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় সম্ভাব্য দুর্ঘটনা নিয়ে শঙ্কিত তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহ মামুন বলেন, এই আতঙ্কের অবসানে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। গ্যাসের নির্গমন ও আগুনের সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
আগুনের উৎসস্থলে নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের প্রবেশ সীমিত করা এবং গ্যাসের নমুনা পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গ্যাসের প্রকৃতি ও নির্গমনের কারণ শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।